ঢাকা, শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২২

শীতকালে বারবার শিশুর সর্দি-কাশি, কী করবেন?

শীতকালে ঘরে ঘরে শিশুদের সর্দি-কাশি লেগে থাকতে দেখা যায়। অনেক শিশু বারবার সর্দিতে আক্রান্ত হয়। কারও কারও ক্ষেত্রে সর্দি হলেই শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়।

সর্দি হলেই আমরা নিউমোনিয়া ভেবে ভয় পেয়ে যাই। শিশুকে অহেতুক এন্টিবায়োটিক খাওয়ানো শুরু করি। এতে শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।

শীতকালে শিশুর শ্বাসকষ্টের প্রধান কারণ ব্রঙ্কিওলাইটিস। ব্রঙ্কিওলাইটিস একটি ভাইরাসজনিত রোগ। এ ভাইরাসটি নাকের শ্লেষ্মা পরীক্ষা করে পাওয়া যায়।

ভাইরাসটির নাম রেসপিরেটরি সিনসাইটিয়াল ভাইরাস (আরএসভি), আমাদের দেশে এ পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। তবে রোগ নির্ণয়ের জন্য মনে রাখতে হবে, দুই বছরের নিচের শিশুর নাকে সর্দির পরে কাশি ও শ্বাসকষ্ট হলে ব্রঙ্কিওলাইটিস হয়েছে বলে ধরে নিতে হবে। এ শিশুরা দ্রুত সুস্থ হয় ও হাসতে থাকে। তাই হাসি, কাশি এবং বুকের বাঁশি-ই ব্রঙ্কিওলাইটিস।

শীতকালে বারবার শিশুদের সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হওয়ার কারণ ও প্রতিকার নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন শিশু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা।

সারা দেশের ৪৩ হাসপাতালে পাঁচ হাজারের বেশি পাঁচ বছরের কম বয়সের শিশুর মধ্যে গবেষণা করে দেখা গেছে, শতকরা ২১ ভাগ শিশু ব্রঙ্কিওলাইটিসে আক্রান্ত হয় এবং ১১ ভাগ শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। এ থেকে প্রমাণিত হয়, ছোট্ট শিশুদের শ্বাসকষ্টের প্রধান কারণ ব্রঙ্কিওলাইটিস— নিউমোনিয়া নয়।

আমাদের শরীরের বুকের মধ্যে দুদিকে দুটি ফুসফুস আছে, যা একটি উল্টানো গাছের মতো। গাছের কাণ্ড থেকে শাখা-প্রশাখা বিস্তারিত হয়ে পাতায় শেষ হয়। এ গাছের কাজ হচ্ছে— আমাদের জন্য অতিপ্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহ করা। পাতার বোঁটায় প্রদাহ হলে (ভাইরাসের কারণে) এটাকে বলে ব্রঙ্কিওলাইটিস এবং পাতায় প্রদাহ হলে নিউমোনিয়া। সুতরাং দুটি এক অসুখ নয়।

ব্রঙ্কিওলাইটিস ছোট্ট শিশুদের হয়ে থাকে, নাক দিয়ে পানি পড়ার পর কাশি ও শ্বাসকষ্ট হয়, জ্বরের মাত্রা কম থাকে, বুকে বাঁশির মতো আওয়াজ হয় এবং শিশু তিন-চার দিনের মধ্যে সুস্থ হয়; কিন্তু ভবিষ্যতে আবারও আক্রান্ত হতে পারে।

নিউমোনিয়া যে কোনো বয়সে হতে পারে। শিশুর খুব জ্বর হয়, অসুস্থতা চেহারায় প্রতিফলিত হয়, কাশি, শ্বাসকষ্ট হয় ও বুকে স্টেথোস্কোপ দিয়ে বিশেষ আওয়াজ পাওয়া যায়। বুকের এক্স-রে করলে কালো ফুসফুসে বিভিন্ন আকৃতির সাদা সাদা দাগ দেখা যায়। রক্ত পরীক্ষায় শ্বেতকণিকার মাত্রা বেড়ে যায়। সেরে উঠতে সময় লাগে এবং একবার ভালো হলে সাধারণত আর হয় না।

এ অসুখে শিশু দ্রুত সুস্থ হয়। ব্রঙ্কিওলাইটিস রোগ নির্ণয়ের জন্য সাধারণত কোনো পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। রক্তের শ্বেতকণিকার মাত্রা স্বাভাবিক থাকে। বুকের এক্স-রে করা যেতে পারে যেখানে ফুসফুসে বেশি বাতাস আটকে থাকার লক্ষণ যেমন— বেশি বড় এবং বেশি কালো ফুসফুস আমরা দেখতে পাই।

ব্রঙ্কিওলাইটিসের চিকিৎসা : ব্রঙ্কিওলাইটিসে কিন্তু বেশিরভাগ শিশুকে বাড়িতে রেখেই চিকিৎসা করা যায়। তবে সুস্থ শিশুদের ব্রঙ্কিওলাইটিসে আক্রান্ত শিশু থেকে সরিয়ে রাখতে হবে। দিনের বেলায় রোদ উঠলে বাচ্চাকে খোলামেলা জায়গাতে রাখুন। জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল আর নাক বন্ধ হয়ে গেলে নরমাল স্যালাইন (লবণপানি) ব্যবহার করা যেতে পারে।

ভাইরাসজনিত এই রোগে অ্যান্টিবায়োটিক লাগে না। শ্বাসকষ্ট খুব বেশি হলে, বাচ্চা অজ্ঞান হয়ে গেলে, খিঁচুনি হলে, ঠোঁট নীল বা কালো হয়ে গেলে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিতে হবে। হাসপাতালে পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও পুষ্টি নিশ্চিত করা গেলে এবং সেই সঙ্গে ৩ শতাংশ সোডিয়াম ক্লোরাইড দিয়ে নেবুলাইজ করলে বেশিরভাগ শিশুই ভালো হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে সালবিউটামল বা স্টেরয়েড দিলে খুব একটা উপকার পাওয়া যায় না।

প্রতিরোধ : বাচ্চার বুকে বা মাথায় ভিক্স, বাম দেওয়া যাবে না। অহেতুক নেবুলাইজার কিংবা যন্ত্রের সাহায্যে কফ পরিষ্কারের নামে সাকশান দেওয়ারও প্রয়োজন নেই। এ সময় তরল খাবার, বিশেষ করে বুকের দুধ ঘন ঘন খাওয়াতে হবে। খুব বেশি কাশি না হলে সপ্তাহে ২-১ বার গোসল করাতে পারবেন, অন্য সময় কুসুম গরম পানিতে পাতলা কাপড় ভিজিয়ে শরীর মুছে দিন।

মতামত দিন