
বিএনপির লোগো
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে অপসারণ করার বিষয়ে দলের অবস্থান পরিবর্তন করেনি বিএনপি। বরং দ্রুত নির্বাচনকেন্দ্রিক সংস্কার সম্পন্ন করে অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করবে এমন প্রত্যাশায় আছে দলটি। নির্বাচন প্রক্রিয়ার বাইরে রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনকে অপসারণ বা অন্য কোনো ইস্যুর সঙ্গে নিজেদের নতুন করে জড়াবেও না দলটি। বরং সাংবিধানিক বা রাজনৈতিক কোনো সংকট যাতে সৃষ্টি না হয়, সেই ব্যাপারে সমমনা রাজনৈতিক দল ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং নাগরিক কমিটির সঙ্গে বোঝাপড়া করে চলবে বিএনপি।
গত সোমবার রাতে রাজধানীর গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এমন অবস্থান নিয়েছে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই সভায় যুক্তরাজ্য থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে সভাপতিত্ব করেন।
রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে দলের অবস্থান প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, এই মুহূর্তে রাষ্ট্রপতি অপসারণ করা হলে দেশে একটা সাংবিধানিক সংকট দেখা দিতে পারে বলে মনে করে গণতন্ত্রপ্রিয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। এই সংকটকে সুযোগ হিসেবে নিতে পারে ফ্যাসিস্ট হাসিনা। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরা তো সেটা হতে দিতে পারি না।
গতকাল দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির একজন নেতা বলেন, রাষ্ট্রপতির ইস্যুতে অন্তর্বর্তী সরকার বিএনপির কাছে কোনো মতামত চায়নি। ছাত্রদের কথায় বিএনপিকে সাড়া দিতে হবে কেন? দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে। তবে আমরা আমাদের আগের অবস্থানেই আছি। দেশে সাংবিধানিক সংকট তৈরির পাঁয়তারা চলছে উল্লেখ করে সম্প্রতি দলটির নেতা সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সাংবিধানিক সংকট যদি হয়, রাষ্ট্রীয় সংকট যদি হয়, রাজনৈতিক সংকট যদি হয় সেই রাজনৈতিক সংকটের পেছনে কী শক্তি আছে, সেটা আগেই আমাদের বিশ্লেষণ করতে হবে।
স্থায়ী কমিটির বৈঠক সূত্রে জানা যায়, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে পালিয়ে ভারতে অবস্থান নেন ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা। সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন একটি গণমাধ্যমকে বলেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগের দালিলিক প্রমাণ নেই। এই নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হলেও সতর্কতার সঙ্গে বিএনপি রাষ্ট্রপতি অপসারণ ইস্যুর সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেনি। রাষ্ট্রপতি অপসারণ ইস্যুতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি সোচ্চার অবস্থানে রয়েছে। তাদের এই দাবির সঙ্গে একমত নয় বিএনপি। তবে এই ইস্যুতে যাতে ছাত্রদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি না হয়, সেদিকে দৃষ্টি থাকবে দলটির।
স্থায়ী কমিটির বৈঠক সূত্রে জানা যায়, রাষ্ট্র মেরামতে ঘোষিত সংস্কার কর্মসূচি এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচন দাবির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বৈঠকে। নীতিনির্ধারকরা গত ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রে নতুন করে কোনো ধরনের সংকট বা জটিলতায় পড়ুক এমন পরিস্থিতি সতর্কভাবে এড়িয়ে চলার অবস্থান প্রকাশ করেন। বিশেষ করে, রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ প্রশ্নে।
সূত্র জানায়, বৈঠকে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ ও করণীয় নিয়ে আলোচনা করেন নীতিনির্ধারকরা। সবার মতামতের ভিত্তিতে বিএনপি আগামী মাসে রাজধানী ঢাকাসহ জেলা ও মহানগরে নতুন করে কর্মসূচি শুরু করবে। রাষ্ট্র মেরামতের লক্ষ্যে ঘোষিত ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবি সামনে রেখে এই কর্মসূচি শুরু করবে দলটি।
সূত্র জানিয়েছে, এসব কর্মসূচির মধ্যে এবারের ৭ নভেম্বর ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ জাঁকজমকভাবে পালন করা হবে। এ উপলক্ষে ঢাকাসহ সারাদেশে জেলা ও মহানগরে ১০ দিনের কর্মসূচি থাকবে। ঢাকায় বড় আকারে শোভাযাত্রা ও আলোচনাসভা হবে। ৭ নভেম্বরকেন্দ্রিক কর্মসূচির পর অবস্থা বুঝে সাংগঠনিক কর্মসূচির গতি বাড়ানো-কমানো হবে। বিএনপির সূত্র জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় হঠাৎ বন্যার কারণে রাজনৈতিক কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছিল। এখন আবার নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
নির্বাচনী এলাকায় সমমনা নেতাদের সবুজ সংকেত : এদিকে নির্বাচনকে সামনে রেখে সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করছে বিএনপি। সেখানে নিজেদের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখার বিষয়টিকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে সম্প্রতি সমমনা দলের কয়েকজন নেতাকে সহযোগিতা করতে স্থানীয় বিএনপিকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, জেএসডির সভাপতি আসম আবদুর রবকে লক্ষ্মীপুর-৪, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাকে বগুড়া-২, জাতীয় দলের চেয়ারম্যান এহসান হুদাকে কিশোরগঞ্জ-৫, গণ-অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে পটুয়াখালী-৩, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকিকে ঢাকা-১২, গণ-অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানকে ঝিনাইদহ-২ নির্বাচনী এলাকায় সহযোগিতা করতে স্থানীয় বিএনপিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
চিঠির বাইরে ১২ দলীয় জোটের বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিমকে মৌখিকভাবে লক্ষ্মীপুর-১ আসনে কাজ করতে বলা হয়েছে। এসব নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক দল। প্রতিটি আসনেই তাদের একাধিক প্রার্থী আছে। এ কারণে তারা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় কাজ করতে বাধা পাচ্ছিলেন। সেটা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নজরে দেওয়া হলে তিনি সমমনা দলের মাঝে যাতে কোনো বিভক্তি না হয়, সে চিন্তা করেই এ চিঠি দিয়েছে বিএনপি।


