ঢাকা, রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২
প্রচ্ছদ » নাগরিক সংবাদ » কালিয়াকৈরে অন্ধবিশ্বাসের ‘ষাঁড়ের পুকুর’ আর পচা জলপান

কালিয়াকৈরে অন্ধবিশ্বাসের ‘ষাঁড়ের পুকুর’ আর পচা জলপান

কালিয়াকৈরে অন্ধবিশ্বাসের ‘ষাঁড়ের পুকুর’ আর পচা জলপান

যখন সংবাদচিত্র ধারণ করতে গেলাম একটি ষাঁড় বাছুর এগিয়ে এসেছিল ভিডিওতে ওর চেহারা দেখাবে বলে। কিছুক্ষণ পর দেখলাম গোশাবকটি রেচন ক্রিয়াজাত উপজাত বের করছে। তার দেহ নিঃসৃত জল ও মল গিয়ে মিশছে পুকুরে।ওই পুকুরের পানি শ্রদ্ধাভরে ও যত্ন নিয়ে এক মা তার শিশুকে পান করাচ্ছেন। তাহলে এখানে নির্বোধ কে? সরলসিধে ওই গরুটি না কি বেখেয়াল ও অসচেতন ওই মা?

বলছিলাম ‘ষাঁড়ের পুকুর’ নিয়ে। গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার জানেরচালা গ্রামে অনেকদিন ধরে ওই পুকুরে এসব চলছে। কিছু নামধারী সাধুসন্তু জলাধারটি পাহারার নাম করে কেটে খাচ্ছে।

পুকুরটিতে কবে কে জানে লড়াই করতে করতে দুটি ষাঁড় ডুবে গিয়েছিল‌। তাই নাকি ওই পুকুরে টাকা, অলংকার, দুধ, ফলমূল ডুবিয়ে দিলে ইচ্ছাপূরণ হয়। কি বিস্ময়কর! এখানে গরু মরা জল মানুষের জীবন জয়ের সূত্র হয়ে ওঠেছে। অথচ এইসময় মানুষের অর্থ ও খাবারের নিয়ে কত আলোচনা চলছে। এই সময়ে খাবারের এমন অপচয় সহ্য করা যায়?

আরও বেশি বিস্ময়কর হলো এই কুসংস্কার ও গোঁড়ামির বাণিজ্যটাকে আবার প্রশাসনিকভাবে রীতিমতো প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। অনেকে বলছেন, স্থানীয় পৌরসভা এখান থেকে মাসে পাচ্ছে ৫০ হাজার তথা বছরে ছয় লাখ টাকা‌। তাহলে যে খাদেম জলে জাল পেতে মাছের পরিবর্তে টাকা ধরেন, তার রোজগার কত?

তালকানা ছেলের নাম পদ্মলোচন হয়। কিন্তু একটি পরিত্যক্ত পুকুর কেমন করে পাক দরবার শরীফে রূপান্তর হয় -পৃথিবীর কোনো পীর-আউলিয়াই এর স্বরূপ উন্মোচন করতে পারবেন না হয়ত। মানুষ জলে দুধ ঢালছে, যা খুশি তাই ফেলছে, আশেপাশের সকল বর্জ্য এসে ওই জলে স্থিতি লাভ করছে -সে পুঁতিগন্ধময় নোংরা জল কিনা শিশুরা পান করছে দাওয়াই হিসেবে, টনিক হিসেবে।

কালিয়াকৈরে অন্ধবিশ্বাসের ‘ষাঁড়ের পুকুর’ আর পচা জলপান

তাই যদি হয়, এই এলাকার সব হাসপাতাল ও খাদ্য সামগ্রীর দোকান বন্ধ করে দিলে হয় না? শিশু বা পৌরবাসীরা ওই জলই খাক, ওখানকার চিকিৎসাই নিক।

আধুনিক সভ্যতা ও বিজ্ঞানের যুগে এসেও সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় মানুষের মধ্যে এমন কুসংস্কার চর্চা বড় বেদনাদায়ক ও লজ্জাজনক বলছেন সচেতন এলাকাবাসী। আধুনিক যুগে এসেও এমন গোঁড়ামির বাণিজ্য বন্ধ করার দাবি জানাতে চাই।

পৃথিবীর বিভিন্ন কোনে ইচ্ছাপূরণের পয়েন্ট আছে। সেসব পয়েন্টে কেউবা তালা আটকে দেন, কেউবা কয়েন বর্ষণ করেন। তবে আমাদের সাব কন্টিনেন্ট ছাড়া অন্যত্র সেটা নিয়ে বাণিজ্য হয় না।

মাঝখানে একটু ভিন্ন গল্প সংযোজন করি।

পুলিশ অফিসার হতে চেয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রিস্টোফার (ক্রিস) জেমস গ্রেইসাস। কিন্তু দুরারোগ্য এক ব্যাধি সাত বছরের ক্রিসকে দাঁড় করিয়ে দেয় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। ক্রিসের এ স্বপ্নের কথা পৌঁছে যায় পুলিশের কাছে। তার ইচ্ছাপূরণে এগিয়ে আসে তারা। ১৯৮০ সালের ২৯ এপ্রিল এক দিনের জন্য পুলিশ অফিসারের চেয়ারে বসানো হয় ক্রিসকে। স্বপ্নপূরণ হয় তার। যদিও ৩ মে মারা যায় ক্রিস।

দূরারোগ্য ব্যাধিতে স্বাভাবিক শৈশব হারিয়ে ফেলা ক্রিস তার জীবনের শেষ কয়েকটা দিন বেঁচেছিল স্বপ্নপূরণের আনন্দ নিয়ে। তার সেই ইচ্ছাপূরণটা এখনো রয়ে গেছে। ২০১০ সালে ক্রিসের ইচ্ছাপূরণের ৩০তম বার্ষিকী থেকে বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ওয়ার্ল্ড উইশ ডে।

আমরাও কিন্তু শিশুদের ইচ্ছা নানাভাবে পূরণ করতে পারি। ঘটা করে উইশ ডে পালন করতে পারি। এখানকার পুকুরে টাকা না ফেলে, দুধ-ফলের অপচয় না করে তা যদি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে সংগ্রহ করা যেত -সেই ফান্ড থেকে নিশ্চিত ভাবেই একটি শিশুর জন্য হাসপাতাল, স্কুল, খেলার মাঠ, লাইব্রেরি, থিয়েটার হল -এমনকি প্রার্থনালয়ও চালানো সম্ভব ছিল।

এই পুকুরের জালে রোজ হাজার হাজার টাকা পড়ে। এছাড়া গরুর শিরনিতে ১০০০, খাসি ৪০০, মুরগিতে ২০০ এবং ফুল শিরনিতে ১০০ টাকা খাদেমের বক্সে জমা করতে হয়। দোকান ভাড়া ১০০ টাকা এবং গাড়ি পার্কিং থেকে ওঠে ৫০ টাকা করে। শুধু ফল ও দুধটাই অযথা যায় জলে। বাকিসব জমা হয় লাভের খেরোখাতায়।

অবশ্য বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। তবে ৩০ বছরের ঐতিহ্য প্রশাসন বন্ধ করতে পারবে না জানি। বরং ‘যথাযথ কর্তৃপক্ষ’ কিংবা রাজনীতিকরা এখানে এসে হয়ত শিরনি খেয়ে যাবেন।

নাগরিক হিসেবে বলার এটুকুই আছে, রাষ্ট্রীয় কাগজের টাকা কেন পচা জলে চুবনি খাবে? সবার চোখের সামনে শিশুদের কেন ষাঁড়ের পুকুরের নোংরা জল পান করানো হবে?

আধুনিক শিক্ষা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের এই সময়েও এমন অজ্ঞানতা দেখতে হবে?

মানুষকে শেখান, বুঝতে দিন। বিশ্বাস হারানো পাপ, তা ঠিক আছে, কিন্তু বিশ্বাসের বিকৃত ভাইরাস বড়ই ভয়ঙ্কর।

ফারদিন ফেরদৌস

মতামত দিন